গাজী মোঃ সফর আলী

parson1
গাজী মোঃ সফর আলী
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঢামাঢোল বাজছে। সে সময় কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার হরিপুর গ্রামে 1932 সালের 1 নভেম্বর মুন্সি সওদাগর আলী প্রধান ও জহুরা বেগমের কোল আলো করে পৃথিবীতে আসেন প্রথম পুত্র সন্তান গাজী মোঃ সফর আলী। তার অন্য তিন ভাই গাজী আবদুর রহমান, নুরূল ইসলাম ও নুরুল আমিন এবং তিন বোন ছমিনা খাতুন, ঈদুন নেছা ও সাফিয়া খাতুন।
হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন শুরু হয় গাজী মোঃ সফর আলীর। অসম্ভব মেধাবি হওয়ায় জীবনে কখনই প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়েননি তিনি। মহিশখোলা জুনিয়র এমই মাইনর স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা শুরু করেন। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় হাজী আলম চাঁন উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম-অষ্টম ও সোনারগাঁও জিআর ইনস্টিটিউশনে নবম-দশম শ্রেণি পর্য্ন্ত পড়াশোনা করেন সফর আলী। ১৯৫২ সালে মেট্রিকুলেশন প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন তিনি। তবে এরপর রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন ইংরেজিতে তুখোর সফর আলী। এ কারণে বছর পাঁচেক পর প্রাইভেটে এইচএসসি পরীক্ষা দিলেও “ডিস্টিংশন মার্কস” (সম্মানসূচক) নিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে সবাইকে চমকে দেন হরিপুরের এই কৃতি সন্তান। ১৯৫৬ সালের ১০ নভেম্বর মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানার বালিয়াকান্দি গ্রামের সভ্রান্ত চৌধুরী পরিবারের মুন্সি ওফাজউদ্দিন চৌধুরী ও হামিদুন নেছার কণিষ্ঠা কণ্যা সালেহা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
১৯৫৮ সালে প্রধান শিক্ষক হিসাবে “কান্দারগাঁও জুনিয়র স্কুল” এ যোগ দেন। ১৯৬৭ সালে স্কুলটি “মুজাফ্ফর আলী উচ্চ বিদ্যালয়” (বর্তমানে কলেজও) নামে বর্তমান জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। তবে ১৯৬৬ সালে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ ছেড়ে সক্রিয়ভাবে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তারপরও বড়কান্দা ইউনিয়ন এলাকার বহু অনিয়মিত শিক্ষার্থীকে নিজ বাড়িতে বিনা বেতনে কোচিং করিয়ে প্রাইভেটে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করান সফর আলী। তখন থেকে “শিক্ষাগুরু” হিসাবে পরিচিতি পান তিনি। ১৯৭১ সালে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাদের অধিকাংশকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেন। আওয়ামীলীগ নেতা হিসেবে তিনি এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন তিনি। তার সাংগঠনিক দক্ষতায় এলাকার বিপুল সংখ্যক তরুণ যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। যুদ্ধক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ ঢাকায় গণহত্যা শুরু হয়। হাজার হাজার মানুষ ঢাকা থেকে পায়ে হেটে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে পথিপধ্যে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার রামপুর বাজারে এসে আশ্রয় নেয়। তাদের আশ্রয়, খাদ্য সহায়তা ও নিরাপত্তা প্রদান করে তার বাহিনী। সে সময় রামপুর বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সেখানে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। এছাড়া ঢাকাসহ এ এলাকায় গেরিলা অপারেশনে অংশ নেয়ার জন্য ভারতের ত্রিপুরা থেকে আগত গেরিলা কমান্ডোদের হরিপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে গোপনে আশ্রয়ে রাখেন। এখান থেকে তারা গেরিলা অপারেশনে যেতেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অবাধ চলাচল ও যুদ্ধের রসদ সামগ্রী আনা-নেয়া বন্ধ করতে ভাটেরচর সেতু ধ্বংস করতে উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত হয়। তার নেতৃত্বে গেরিলা অপারেশন হলে বড় ভূমিকা রাখেন সিরাজউদ্দিন আহমেদ (ডিপটি মিয়া), গজারিয়ার থানা কমান্ডার রফিকুল ইসলাম। ১৯৬৯ সাল থেকে মেঘনা উপজেলায় (তৎকালীন দাউদকান্দি ও হোমনা থানার অংশবিশেষ) আওয়ামীলীগকে রাজনৈতিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন গাজী মোঃ সফর আলী। এ অঞ্চলের তৎকালীন জাতীয় সংসদ সদস্য জনাব মোঃ মুজাফফর আলী (কান্দারগাঁও মুজাফফর আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা) ও তার কঠোর পরিশ্রমে যুদ্ধকালে এলাকাটি স্বাধীনতাকামী মানুয় ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল। এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
যুদ্ধ পরবর্তীকালে রাজনীতির পাশাপাশি ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন সফর আলী। ১৯৭৪ সালে পরিবারের সদস্যরা স্থায়ীভাবে নারায়ণগঞ্জে বসবাস শুরু করলেও তিনি আওয়ামীলীগের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সাবেক এমপি দাউদকান্দির ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন, মোজাফফর আলী, গজারিয়ার অধ্যাপক শামসুল হুদা, সোনারগাঁওয়ের সাজেদ আলী মোকতার, আওয়ামীলীগ নেতা মুরাদনগরের ডা. ওয়ালী, দেবীদ্বারের ক্যাপ্টেন (অব.) সুজাত আলীর সঙ্গে রাজনীতি করে বেশ সুনাম অর্জন করেন। ১৯৭৭ সালের ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বড়কান্দা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বড়কান্দা ইউনিয়নের রাস্তা-ঘাট, সেতু, মসজিদ, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা নিমার্ণ ও মেরামতসহ ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন।
বর্তমানে তিনি স্ত্রী-পুত্র-কণ্যাদের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জে অবসরকালীণ জীবন-যাপন করছেন। তবে তিনি এখনো সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।